ঢাকাশনিবার , ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
  1. অষ্টগ্রাম
  2. ইটনা
  3. কটিয়াদী
  4. করিমগঞ্জ
  5. কুলিয়ারচর
  6. কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. তাড়াইল
  9. নিকলি
  10. পর্যটন
  11. পাকুন্দিয়া
  12. বাজিতপুর
  13. বিনোদন
  14. ভৈরব
  15. ভোটের বাঁশি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কালের সাক্ষী কটিয়াদীর গোপীনাথ জিউর মন্দির: ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ৬৭তম বর্ষের নাম যজ্ঞানুষ্ঠান শুরু

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ১৭, ২০২৬ ২:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের ভোগবেতাল গ্রামটি এখন আর নিছক কোনো ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং ভক্তি ও ইতিহাসের এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কুয়াশাঘেরা শীতের এই সময়ে এখানকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে চন্দন আর ধূপের সুগন্ধে। উপলক্ষ্য—ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর মন্দিরে অনুষ্ঠিত ৬৭তম ৫৬ প্রহরব্যাপী শ্রীশ্রী তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্তন মহাযজ্ঞ। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মহোৎসব আগামী ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত থাকবে।

তবে এই মন্দিরের মহিমা কেবল এই বাৎসরিক উৎসবে সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, যা কটিয়াদী তথা ভাটি অঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত কিশোরগঞ্জ জেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম গর্বের। লোকমুখে শোনা যায়, ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় এক দৈব স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরের কিছু প্রাচীন ভবনগুলো আজও সেই হারানো দিনের রাজকীয় ভক্তি ও ঐতিহ্যের গল্প শোনায়। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা বার ভূঁইয়াদের অন্যতম বীর ঈশা খাঁ-ও নাকি এই মন্দিরের মহিমায় মুগ্ধ হয়েছিলেন; কথিত আছে, তিনি এই মন্দিরের প্রসাদ গ্রহণ করে অত্যন্ত প্রসন্ন ও তৃপ্ত হয়েছিলেন।

সুপ্রাচীন স্থাপত্যশৈলী আর আধ্যাত্মিকতার এমন মেলবন্ধন সচরাচর দেখা যায় না। সেই ঐতিহাসিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, ৬৭ বছর ধরে চলে আসা এই নামযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের মানুষের ধর্মানুরাগ ও ঐতিহ্যের শিকড় কতটা গভীরে। গোপীনাথ জিউর কৃপা লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা ভক্তদের ভিড় এই স্থানটিকে এক আধ্যাত্মিক তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করে।

এই মহাযজ্ঞের শুভ অধিবাসে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য এক পরম প্রাপ্তি। পরম বৈষ্ণব প্রাণগৌরাঙ্গ দাসের কণ্ঠে যখন শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ ও অধিবাস কীর্তনের সুর লহরী ভেসে আসছিল, তখন মনে হচ্ছিল ৫০০ বছরের পুরনো এই দেওয়ালগুলোও যেন সেই সুরে সাড়া দিচ্ছে। চারপাশ স্তব্ধ, শুধু ভক্তিযুক্ত সুধার অনুভব। কীর্তনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ভক্তরা যেন মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কারো চোখে জল, কারো বা কণ্ঠে ভক্তির কাঁপন— এই অশ্রুই যেন ছিল গোপীনাথের চরণে নিবেদিত প্রার্থনার সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষা।

দীর্ঘদিনের সুপ্ত এক বাসনা যেন পূর্ণতা পেল এই সাধুসঙ্গ ও হরিনামের ধ্বনিতে। এত বিশাল, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল আয়োজন কোনো জাদুবলে হয় না। শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর মন্দিরের এই মহাযজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত মন্দির পরিচালনা কমিটি এবং ৬৭তম নামযজ্ঞ উদযাপন পরিষদের প্রতিটি সদস্যের নির্ঘুম রাত, কঠোর পরিশ্রম আর অকাতর ত্যাগের ফলেই আজকের এই পবিত্র পরিবেশ সম্ভব হয়েছে।

রাজা নবরঙ্গ রায়ের সেই মশাল আজ এই ভক্তবৃন্দের হাতেই প্রজ্বলিত। তাদের নিষ্ঠা ও ভক্তি এই আয়োজনকে কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এটি আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও আত্মিক বন্ধনের এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে।

পরিশেষে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে হরি নামেই শান্তি, হরি নামেই মুক্তি। কটিয়াদীর আচমিতার এই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে মনে হয়, গোপীনাথের কৃপা যেন প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে প্রবহমান। এই মহাযজ্ঞ সফল হোক, এবং এর মাধ্যমে সকলের জীবনে ভক্তি, শান্তি ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক। জয় গোপীনাথ।

লেখক : সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশিক্ষক, ঢাকা।