কিশোরগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ছিনতাই, দায় নেবে কে?
গেল বছরের ১৪ মে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা। কিশোরগঞ্জ শহরের আখড়াবাজার সেতু থেকে সরু গলি ধরে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের মুক্তমঞ্চের দিকে যাচ্ছিলেন শাহাদাত হোসেন নামের এক যুবক। আকাশে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আবহে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর জন্য সেই সন্ধ্যা পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতায়।
আখড়াবাজার সেতু থেকে নামার পর একটি পরিত্যক্ত ভবনের সামনে পৌঁছাতেই হঠাৎ ৫ থেকে ৭ জন কিশোর তাঁকে ঘিরে ধরে। কোনো কথাবার্তা নয়, কোনো পূর্বাভাস নয়। আচমকাই একজন তাঁর গলা চেপে ধরে। আরেকজন পকেটে থাকা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন একদল কিশোরের আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি।মোবাইল ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই শুরু হয় কিল-ঘুষি। কয়েক মিনিট ধরে চলে মারধর। আশপাশে লোকজন থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত প্রাণ ও শরীর বাঁচাতে বাধ্য হয়েই নিজের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ তুলে দেন ছিনতাইকারীদের হাতে। মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো নিয়ে গা-ঢাকা দেয় তারা।
রক্তাক্ত ও আতঙ্কিত অবস্থায় শাহাদাত হোসেন আশপাশের কয়েকজন দোকানদারের কাছে জানতে চান কারা এই ছেলেরা। কিন্তু কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। স্থানীয়দের নীরবতা যেন জানিয়ে দিচ্ছিল, ঘটনাটি নতুন কিছু নয়।
প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় অভিযোগ করতে যান। কিন্তু সেদিন অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। অভিযোগ গ্রহণ করা হয় পরদিন দুপুরে। পরে পুলিশ চারজনকে আটক করলেও ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন আর ফেরত পাওয়া যায়নি। ক্ষতিপূরণও নয়। স্থানীয় কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায় অভিযুক্তরা।
এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটি কিশোরগঞ্জ শহরের একজন সাধারণ নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন অভিজ্ঞতা আজ আর ব্যতিক্রম নয়।
গেল সোমবার বিকেলেও প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা কাঁপিয়েছে কিশোরগঞ্জকে। কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছিল সালমান সানি নামের এক স্কুলশিক্ষার্থী। শহরের আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন রেলক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর পথরোধ করে।
ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে সে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখনও সেখানে চিকিৎসাধীন সে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন গ্রুপে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় ছিনতাই, হামলা কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে পোস্ট। কখনো কেউ মোবাইল হারানোর কথা জানান, কখনো মারধরের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা লিখেন, আবার কখনো সতর্ক করে দেন নির্দিষ্ট কোনো এলাকা এড়িয়ে চলতে। একসময় যেসব ঘটনা মানুষ ফিসফিস করে বলত, এখন সেগুলো প্রকাশ্যে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান কি হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে উদ্ধার করা হয় কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওনের মরদেহ। আনন্দ মোহন কলেজের এই শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে কিশোর ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক শিক্ষার্থী পালিয়ে ফিরতে পারলেও শাওন আর জীবিত ফিরে আসেননি। একটি ছিনতাইচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেয় একটি তরতাজা প্রাণ।
তিনটি ঘটনা, তিনটি ভিন্ন সময়, ভিন্ন স্থান। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে—সব কটির ছায়ায় রয়েছে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইচক্রের উপস্থিতি। গত কয়েক বছরে কিশোরগঞ্জ শহরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার, স্থানীয় সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহরের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইচক্র। আখড়াবাজার, মুক্তমঞ্চ এলাকা, রেলক্রসিং, পার্ক, নির্জন গলি কিংবা সন্ধ্যার পর তুলনামূলক কম জনসমাগমের স্থানগুলো তাদের জন্য নিরাপদ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
পদ্ধতিটাও প্রায় একই। আগে থেকে ওত পেতে থাকা। একা কাউকে টার্গেট করা। ভয়ভীতি দেখানো। মোবাইল, টাকা কিংবা মূল্যবান জিনিস দাবি করা। বাধা পেলে মারধর। প্রয়োজনে অস্ত্রের ব্যবহার। এরপর দ্রুত সরে পড়া। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠে দেখা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কিশোরই মূল পরিকল্পনাকারী নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের পেছনে থাকে বড় একটি নেটওয়ার্ক। কিশোরদের ব্যবহার করা হয় সামনের সারির কর্মী হিসেবে। আর আড়ালে থাকা ব্যক্তিরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কিন্তু অপরাধীদের সাহস এত বাড়ল কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকেও তাকাতে হয়। শহরে ছিনতাইয়ের অভিযোগ বাড়ছে, কিন্তু দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা বাড়ছে? গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল কতটা আছে? অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি কতটা হচ্ছে? গ্রেপ্তারের পর বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর?
এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে নেই।
একটি শহরের মানুষ যখন সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট রাস্তা এড়িয়ে চলতে বাধ্য হয়, যখন অভিভাবকরা সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন, যখন ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি থানায় গিয়েও দ্রুত প্রতিকার পান না—তখন সেটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না; সেটি সামাজিক নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়।প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির দায় নেবে কে? কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেবে কে? ছিনতাইয়ের শিকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
প্রশ্নগুলো শুধু প্রশাসনের প্রতি নয়। জনপ্রতিনিধি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, সবার প্রতিই।