Kishoreganj Press

মশিউর রহমান কায়েস

মশিউর রহমান কায়েস

সম্পাদক


বেঁচে আছেন জমিদার !

চারশ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি, যেখানে অতীতের স্মৃতি আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য ইতিহাসকিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চারশ বছরের পুরোনো গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মানবাবুর বাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত। ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাসাদ আজও জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি একসময় ছিল অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও এর বিশাল দালান, নান্দনিক কারুকাজ ও রাজকীয় স্থাপত্য আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৬শ শতাব্দীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আগত এক উচ্চশিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পূর্ববঙ্গে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরাই গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবারটি এলাকায় বিশেষ মর্যাদা অর্জন করে।এই বংশের দীননাথ চক্রবর্তী ছিলেন গাঙ্গাটিয়ার প্রথম জমিদার। আঠারো শতকের শেষভাগে তিনি হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ ক্রয় করে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তাঁর উত্তরসূরিরা আরও জমি ক্রয় করে জমিদারির পরিধি বাড়ান। ধীরে ধীরে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি পরিণত হয় একটি সমৃদ্ধ এস্টেটে।জমিদার বাড়ির স্থাপত্যশৈলী বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রোমান ও গ্রিক স্থাপত্যরীতির প্রভাব স্পষ্ট এই ভবনের নকশায়। বিশাল স্তম্ভ, খিলান, অলংকৃত কারুকাজ এবং সুপরিকল্পিত নির্মাণশৈলী একে অন্য সব জমিদার বাড়ি থেকে আলাদা করেছে। দুই তলা বিশিষ্ট মূল ভবনে রয়েছে অতিথিশালা, দরবার কক্ষ, আদালত কক্ষ, সংগীতচর্চার কক্ষ, কাচারিঘর ও নাহাবতখানা। বাড়ির সামনের প্রশস্ত উঠান এবং চারপাশের উঁচু প্রাচীর অতীতের জমিদারি ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।মূল প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে নারকেল গাছে ঘেরা দীর্ঘ রাস্তা। কিছু দূরে রয়েছে ঐতিহাসিক শ্রীধর ভবন। জমিদার বাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে আছে একাধিক প্রাচীন স্থাপনা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিবমন্দির এবং বিশাল সাগরদিঘী। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এসব স্থাপনা এখনও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।গাঙ্গাটিয়া জমিদার বংশের বর্তমান ও শেষ উত্তরাধিকারী মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী, যিনি এলাকায় ‘মানব বাবু’ নামে পরিচিত। বয়স ৯৩ পেরোলেও এখনও তিনি এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতেই বসবাস করছেন। কলকাতায় শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি দীর্ঘ সময় জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। ১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা জমিদার পরিবারের ওপর নির্মম হামলা চালায়। ওই হামলায় নিহত হন মানবেন্দ্র বাবুর বাবা ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অংশ। বর্তমানে সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ।একসময় জমিদারি প্রথার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বাড়ি এখন পর্যটক, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণের জায়গা। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন অতীতের স্থাপত্য ও ইতিহাসের ছোঁয়া নিতে।তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে বাড়িটির কিছু অংশ। স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে যেমন রক্ষা পাবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।চার শতাব্দীর ইতিহাস, জমিদারি ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি কিশোরগঞ্জের গৌরব, ইতিহাসের জীবন্ত দলিল এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ।

বেঁচে আছেন জমিদার !