Kishoreganj Press

ছাইদুর রহমান নাঈম

ছাইদুর রহমান নাঈম

বিশেষ প্রতিনিধি


কটিয়াদী পৌরসভা যেন দুর্ভোগের আরেক নাম, বেহাল সড়ক-জলাবদ্ধতায় হাহাকার

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি ও ময়লা-আবর্জনার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। কাগজে-কলমে দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভা হলেও নাগরিক সেবার মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। প্রতিবছর বাজেট ঘোষণা হলেও উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রভাব না থাকায় হতাশ পৌরবাসী।পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হেলিপ্যাড সড়ক থেকে বীরনোয়াকান্দী মহল্লা পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে মাটির এ সড়কে আজও ইটের ছোঁয়া লাগেনি। সময়ে সময়ে জনপ্রতিনিধি ও সরকার পরিবর্তন হলেও রাস্তাটির উন্নয়ন হয়নি। ফলে জনবহুল এ মহল্লার মানুষের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ভোটের সময় উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।একই চিত্র পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোগপাড়া মহল্লার একটি কাঁচা সড়কের। এছাড়া ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ প্রায় সব এলাকাতেই রয়েছে ভাঙাচোরা ও কাঁচা সড়ক, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নানা অবকাঠামোগত সমস্যা। কোথাও কোথাও দেখে এটি ইউনিয়ন নাকি পৌরসভা, তা বোঝাও কঠিন। এমনকি পৌর ভবনের পেছনের সড়কও সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায়।জানা যায়, ২০০১ সালে কটিয়াদী পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৬ বছর পার হলেও নাগরিক সেবার মান আশানুরূপ উন্নত হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পৌর সদর, চড়িয়াকোনা, কামারকোনা, বীরনোয়াকান্দীসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বাজারের অনেক দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। অধিকাংশ ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। নতুন নির্মিত কয়েকটি সড়কের পাশও ভেঙে যাচ্ছে। সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সড়কবাতি না থাকায় অন্ধকার নেমে আসে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৪ কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে বাজেট ছিল ২১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার ২৭৭ টাকা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প গ্রহণ, বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয় না। তদারকির অভাবে অতীতেও নিম্নমানের কাজ হয়েছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে।বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্যোগকালেও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠে দেখা যায় না। বছরের পর বছর ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না। মাঝে মধ্যে পরিষ্কার করলেও ড্রেনের পাশে তুলে রাখা ময়লা আবার বৃষ্টির পানিতে ড্রেনেই পড়ে গিয়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত করে। নাগরিক সেবা পেতেও মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়।পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আব্দুর রাশিদ বলেন, “আমাদের এলাকার একটি রাস্তা এখনো কাঁচা। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত একটি ইটও পড়েনি। আমাদের কাছ থেকে কর নেওয়া হয়, কিন্তু নাগরিক অধিকার দেওয়া হয় না। বৃষ্টি হলে মসজিদে গিয়ে নামাজও পড়তে পারি না। অসুস্থ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভোট এলেই শুধু নানা প্রতিশ্রুতি শুনি।”সমাজকর্মী মতিউর রহমান মতি বলেন, “প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরেও উন্নয়নের তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। পৌরসভা আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় জবাবদিহি কমে গেছে। প্রতিবছর বাজেটের অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, আমরা জানতে পারি না। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অডিট, প্রতিটি প্রকল্পের কার্যকর তদারকি এবং সব তথ্য উন্মুক্ত প্রকাশের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।”স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বলেন, “বৃষ্টিতে বাড়িতে পানি উঠে যাচ্ছে। আমার ছেলেমেয়েরা কয়েকবার গর্তে পড়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। পৌরসভার লোকজন আসব, আসছি বলে আর আসেনি। এমন দুর্যোগেও তাদের কোনো সাড়াশব্দ নেই। পৌরসভা আমাদের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”এ বিষয়ে কটিয়াদী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কারার দিদারুল মতিন বলেন, “অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। লোকবল সংকট রয়েছে। প্রয়োজন হলে পৌর প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠকর্মীরা ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করছেন। পৌরবাসীকে সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা দিতে আমরা আন্তরিক।”তবে কোন কোন এলাকায় বর্তমানে কাজ চলছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট এলাকার তথ্য সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার বলতে পারবেন। সমস্যা অনেক রয়েছে। ধাপে ধাপে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুর্যোগের সময় পৌর কর্মীদের অবশ্যই মাঠে থাকা উচিত।”এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কটিয়াদী পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক লাবনী আক্তার তারানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

কটিয়াদী পৌরসভা যেন দুর্ভোগের আরেক নাম, বেহাল সড়ক-জলাবদ্ধতায় হাহাকার