Kishoreganj Press

ছাইদুর রহমান নাঈম

ছাইদুর রহমান নাঈম

বিশেষ প্রতিনিধি


কিশোরগঞ্জে উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম কম ডিমের, সংকটে হাজারো খামারি

কিশোরগঞ্জে বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে পোলট্রি খাত। ব্যক্তি উদ্যোগে জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ হাজার পোলট্রি খামার। এসব খামারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার মানুষের। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে ডিম ও মুরগির বাজারদর কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন জেলার হাজারো প্রান্তিক খামারি।খামারিদের অভিযোগ, খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি ডিম ও মুরগির দাম। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না। অনেকেই ঋণ নিয়ে খামার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে জেলার অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু রয়েছে সেগুলোও টিকে থাকার লড়াই করছে।খামারিদের দাবি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিকভাবে ডিম ও মুরগি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ডিম ও মুরগির উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।নায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ খামারি: কিশোরগঞ্জ প্রেসসম্প্রতি এসব দাবিতে কিশোরগঞ্জের খামারি ও ব্যবসায়ীরা মহাসড়কে ডিম ফেলে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় সবচেয়ে বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে কুলিয়ারচর, বাজিতপুর ও কটিয়াদী উপজেলায়। এছাড়া জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই ছোট-বড় খামার রয়েছে।সরেজমিনে কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ও চান্দপুর ইউনিয়ন এবং বাজিতপুর ও কুলিয়ারচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে হতাশার চিত্র উঠে এসেছে।কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের খামারি রফিকুল ইসলাম বলেন, “ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবারের টাকাও ওঠে না। ওষুধসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”উপজেলার পিরোজপুর এলাকার খামারি সালাহউদ্দিন বলেন, “বর্তমানে একটি ডিম বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ পড়ে সাড়ে আট থেকে নয় টাকা। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কয়েকটি সিন্ডিকেট কোল্ড স্টোরেজে ডিম মজুত রেখে ইচ্ছেমতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার তিনটি খামারের মধ্যে একটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন ঋণ করে মুরগির খাবার কিনতে হচ্ছে।”নিজ খামারে পরিচর্যায় ব্যস্ত খামারি: কিশোরগঞ্জ প্রেসকুলিয়ারচর উপজেলার দাড়িয়াকান্দি এলাকার খামারি নূরে আলম বলেন, “বাজারে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ও সিন্ডিকেটের কারণে আমরা উৎপাদিত ডিমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। প্রতিদিন ডিম বিক্রি হলেও লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও ওঠে না। সরকারকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”পোল্ট্রি ডিলার অ্যাসোসিয়েশন, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন মান্নান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের স্বার্থে করপোরেট কোম্পানিগুলোর ডিম ও মুরগি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়েছে।”এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব মূলত উৎপাদন বৃদ্ধি করা, বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়। তবে খামারিদের সমস্যা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”তিনি আরও বলেন, “অনেক সময় খামারিদের মধ্যেও সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সরকার এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। গত সাত-আট মাস ধরে ডিমের দাম কম থাকলেও ব্রয়লার, কক ও সোনালি মুরগির বাজার তুলনামূলক ভালো। ভোক্তা ও খামারি—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।এমএআই/এসআরএন 

কিশোরগঞ্জে উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম কম ডিমের, সংকটে হাজারো খামারি