Kishoreganj Press

ফিজিওথেরাপিতে অবহেলার অভিযোগ, রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত



ফিজিওথেরাপিতে অবহেলার অভিযোগ, রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত

কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে স্ট্রোকজনিত এক রোগীর পায়ে থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে তা চালু অবস্থায় রেখে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ না করার অভিযোগ উঠেছে। এতে রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।

এ ঘটনা গত ২১ জুন ভুক্তভোগী রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আবিদুর হক হাসপাতালের উপ-পরিচালকের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন (৬০) কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনডোর বিভাগের এমএমডব্লিউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অভিযুক্ত কামরুজ্জামান সোহাগ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লিখিত অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর আলমগীর হোসাইনকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ তাকে ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন।

চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ মে তাকে হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর বাম পায়ে একটি থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে চালু করেন। কিন্তু মেশিন চালু করার পর তিনি রোগীর পাশে অবস্থান না করে অন্যত্র চলে যান। যাওয়ার আগে রোগীকে বলেন, পায়ে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হলে তাকে ডাকতে। কিন্তু স্ট্রোকজনিত কারণে শরীরের অনুভূতি স্বাভাবিক না থাকায় রোগী নিজে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেননি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ সময় মেশিনটি চালু থাকায় রোগীর পায়ে তীব্র তাপের প্রভাব পড়ে। এতে পায়ের চামড়ায় ফোসকা পড়ে এবং পরবর্তীতে ক্ষত তৈরি হয়। একপর্যায়ে আক্রান্ত স্থানে পচন ধরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিষয়টি ফিজিওথেরাপিস্টকে জানানো হলেও তিনি গুরুত্ব না দিয়ে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও মলম ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আবিদুর হক বলেন, “আমার বাবা স্ট্রোক করার পর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার পায়ে থেরাপি মেশিন লাগিয়ে বাইরে চলে যান। বাবা তখনই বলেছিলেন যে তিনি গরম লাগলেও বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তাকে বলা হয়, সমস্যা হলে ডাকতে। ঘটনার পর আমাদের বলা হয়েছিল অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। পরে বাড়িতে নেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বাবার পা ফুলে যায় এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আমরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাইনি।”

পরিবারের দাবি, ১২ মে জেলা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে রোগীকে নিয়ে গেলে তিনি রোগীর অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আবিদুর হক বলেন, “আমরা বাবাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, ক্ষতস্থানে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং স্নায়ুরও ক্ষতি হয়েছে। এখন তিনি স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইতোমধ্যে চিকিৎসায় প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সামনে আরও কত খরচ হবে তা আমরা জানি না। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে কসমেটিক সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে।”

তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো রোগী যেন অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ফিজিওথেরাপি বিভাগের সেবার মান, রোগী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্টের অবহেলা, রোগীকে পর্যবেক্ষণে ব্যর্থতা এবং ঘটনার পর যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে রোগীকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।

এ ঘটনায় হাসপাতালের উপ-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি রোগীরা এমন ঘটনার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্য ঘটনা প্রকাশ করা উচিত।”

রুগীর স্বজন খায়রুল ইসলাম বলেন, “ফিজিওথেরাপির মতো সেবায় রোগী পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় কোনো গাফিলতি থাকলে তা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

ফারুক নামের এক সেবাপ্রত্যাশী রোগী বলেন, “সরকারি হাসপাতালের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার মান ও তদারকি ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি ২০১৭ সাল থেকে পেশাগতভাবে ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে আসছি। প্রতিদিন হাসপাতালে এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক রোগীকে চিকিৎসা দিই। এ পর্যন্ত কোনো রোগী আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেননি।

তিনি বলেন, ‘রোগীরাই আমার মূল শক্তি ও আস্থার জায়গা। যদি এমন কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটত, তাহলে রোগীর স্বজনরা সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি আমাকে জানাতেন। আমি প্রত্যেক রোগীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে চিকিৎসা প্রদান করি।’

কামরুজ্জামান সোহাগ আরও বলেন, ‘আমি আইআরআর (Infrared Radiation) থেরাপি দেওয়ার আগে রোগীর অনুভূতির মাত্রা পরীক্ষা করি এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করি। নির্দিষ্ট দূরত্ব ও নির্ধারিত সময় মেনে থেরাপি দেওয়া হয়। ডায়াবেটিসসহ সব ধরনের রোগীর ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা অনুসরণ করা হয়। রোগীর শরীরে কোনো ফোলা বা বিশেষ জটিলতা থাকলে তা বিবেচনায় নিয়েই চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর যদি কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিত, তাহলে রোগীর স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে অবহিত করতেন।’

এ বিষয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. নাজমুল করিম বলেন, এ বিষয়ে আমি আগে অবগত ছিলাম না, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেহেতু বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালক অবগত হয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। আমিও পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব। যদি কোনো অবহেলার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Kishoreganj Press

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


ফিজিওথেরাপিতে অবহেলার অভিযোগ, রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে স্ট্রোকজনিত এক রোগীর পায়ে থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে তা চালু অবস্থায় রেখে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ না করার অভিযোগ উঠেছে। এতে রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।

এ ঘটনা গত ২১ জুন ভুক্তভোগী রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আবিদুর হক হাসপাতালের উপ-পরিচালকের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন (৬০) কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনডোর বিভাগের এমএমডব্লিউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অভিযুক্ত কামরুজ্জামান সোহাগ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লিখিত অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর আলমগীর হোসাইনকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ তাকে ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন।

চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ মে তাকে হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর বাম পায়ে একটি থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে চালু করেন। কিন্তু মেশিন চালু করার পর তিনি রোগীর পাশে অবস্থান না করে অন্যত্র চলে যান। যাওয়ার আগে রোগীকে বলেন, পায়ে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হলে তাকে ডাকতে। কিন্তু স্ট্রোকজনিত কারণে শরীরের অনুভূতি স্বাভাবিক না থাকায় রোগী নিজে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেননি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ সময় মেশিনটি চালু থাকায় রোগীর পায়ে তীব্র তাপের প্রভাব পড়ে। এতে পায়ের চামড়ায় ফোসকা পড়ে এবং পরবর্তীতে ক্ষত তৈরি হয়। একপর্যায়ে আক্রান্ত স্থানে পচন ধরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিষয়টি ফিজিওথেরাপিস্টকে জানানো হলেও তিনি গুরুত্ব না দিয়ে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও মলম ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আবিদুর হক বলেন, “আমার বাবা স্ট্রোক করার পর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার পায়ে থেরাপি মেশিন লাগিয়ে বাইরে চলে যান। বাবা তখনই বলেছিলেন যে তিনি গরম লাগলেও বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তাকে বলা হয়, সমস্যা হলে ডাকতে। ঘটনার পর আমাদের বলা হয়েছিল অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। পরে বাড়িতে নেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বাবার পা ফুলে যায় এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আমরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাইনি।”

পরিবারের দাবি, ১২ মে জেলা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে রোগীকে নিয়ে গেলে তিনি রোগীর অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আবিদুর হক বলেন, “আমরা বাবাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, ক্ষতস্থানে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং স্নায়ুরও ক্ষতি হয়েছে। এখন তিনি স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইতোমধ্যে চিকিৎসায় প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সামনে আরও কত খরচ হবে তা আমরা জানি না। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে কসমেটিক সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে।”

তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো রোগী যেন অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ফিজিওথেরাপি বিভাগের সেবার মান, রোগী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্টের অবহেলা, রোগীকে পর্যবেক্ষণে ব্যর্থতা এবং ঘটনার পর যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে রোগীকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।

এ ঘটনায় হাসপাতালের উপ-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি রোগীরা এমন ঘটনার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্য ঘটনা প্রকাশ করা উচিত।”

রুগীর স্বজন খায়রুল ইসলাম বলেন, “ফিজিওথেরাপির মতো সেবায় রোগী পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় কোনো গাফিলতি থাকলে তা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

ফারুক নামের এক সেবাপ্রত্যাশী রোগী বলেন, “সরকারি হাসপাতালের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার মান ও তদারকি ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি ২০১৭ সাল থেকে পেশাগতভাবে ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে আসছি। প্রতিদিন হাসপাতালে এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক রোগীকে চিকিৎসা দিই। এ পর্যন্ত কোনো রোগী আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেননি।

তিনি বলেন, ‘রোগীরাই আমার মূল শক্তি ও আস্থার জায়গা। যদি এমন কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটত, তাহলে রোগীর স্বজনরা সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি আমাকে জানাতেন। আমি প্রত্যেক রোগীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে চিকিৎসা প্রদান করি।’

কামরুজ্জামান সোহাগ আরও বলেন, ‘আমি আইআরআর (Infrared Radiation) থেরাপি দেওয়ার আগে রোগীর অনুভূতির মাত্রা পরীক্ষা করি এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করি। নির্দিষ্ট দূরত্ব ও নির্ধারিত সময় মেনে থেরাপি দেওয়া হয়। ডায়াবেটিসসহ সব ধরনের রোগীর ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা অনুসরণ করা হয়। রোগীর শরীরে কোনো ফোলা বা বিশেষ জটিলতা থাকলে তা বিবেচনায় নিয়েই চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর যদি কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিত, তাহলে রোগীর স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে অবহিত করতেন।’

এ বিষয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. নাজমুল করিম বলেন, এ বিষয়ে আমি আগে অবগত ছিলাম না, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেহেতু বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালক অবগত হয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। আমিও পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব। যদি কোনো অবহেলার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


Kishoreganj Press

চেয়ারম্যান: শফিকুল আলম শিপলু
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ফিজিওথেরাপিতে অবহেলার অভিযোগ, রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত
0:00 / 0:00
1x